প্রবাহমান জীবনের কথা- ৫

জীবনটা একেক জনের দৃষ্টিকোণ থেকে একেক রকম। জীবনের অর্থ হয়তো আমি বুঝি সরল রেখায়, অন্য কেউ তা নাও বুঝতে পারেন।তাদের কাছে আমার দৃষ্টিকোণ অস্বাভাবিক।প্রত্যকেই স্বীয় চেতনা হতে জীবনকে উপলদ্ধি করেন। কারো ভাবনার সাথে কারো যোগসূত্র নেই!

আজ কেন জানি হুমায়ূন স্যার এর ভূত চেপেছে মাথায়! এই মহান ব্যাক্তিটি কারো কারো অপ্রিয় ও হতে পারেন। আমার খুব প্রিয় একজন লেখক হুমায়ূন আহমেদ। তার অসংখ্য বই আমি পড়েছি ছোট্ট বেলায়। একটা সময় হিমুর খুব ভক্ত ছিলাম। আর বাস্তবে নিজেকে হিমু সাজানোর চেষ্টায় পকেটবিহীন সেই হলদে পাঞ্জাবি, খালি পা …… অদ্ভুত একটা অনুভূতি ছিল। যাই হোক, এখন বড় হয়েছি। বুঝতে শিখেছি বাস্তবে হিমুর কোন অস্তিত্ব নেই। হিমু কেবল একটা মেটাফোর, অস্বাভাবিকতার বিরোধী তীব্র আন্দোলনের একটা স্বাভাবিক উদাহরণ।

একটু ভিন্ন ভাবে বলি- হিমুর ভাবনা-চিন্তা, সোজা সাপটা জবাব, জীবনকে এত সহজভাবে নিয়ে তাকে শাসন করার সাহস, সব কিছুই যেন এই সমাজের নিয়ম রীতিগুলোকে বদলে দেয়ার একটা ভিন্ন প্রয়াস।এই হিমু চরিত্রটা ছিল স্যার এর একটি প্রতিবাদী চরিত্র। সহজ ভাষায় তিনি অকপটে লিখে গেছেন মানুষের কথা, এই সমাজ ব্যাবস্থার পরিবর্তনের কথা, অবিচার, নিত্যদিনের ঘটে যাওয়া খন্ড চিত্র, আবেগ-অনুভূতি, মানুষের মনের সুপ্ত বাসনা, লুকায়িত কামনা, পাপবোধ, ও ব্যর্থতার কথা। তার কোন লেখাতেই বিরক্তির উদ্রেক কখনো ঘটেনি। তিনি হিমু, রুপা, মিসির আলীর চরিত্র দিয়ে নানানভাবে পাঠককুলে একটা ভিন্ন পবিবেশ তৈরী করে গেছেন।

অথচ হিমুকে নিয়ে লিখা তার বইগুলিতে কাহিনী তেমন কিছুই নেই। নিত্যদিনের সমাচার, হতাশা, সমস্যা জর্জরিত সমাজ ও রাজনীতি, হাস্যকর মিডিয়া, আর স্বেচ্ছাচারীতাই বেশী। এই যে বাস্তবতা আর কুৎসিত জীবন শৃঙ্খলার মাঝে একটা সামঞ্জস্য রক্ষা করে নিজের অবস্থান তৈরি করে নেয়া, এটার জন্যই হিমু আজ মানুষের মনে প্রাণে। হিমুর বৈশিষ্ট্য এটাই-অতি সাধারণ আবার অতি অসাধারণ।

স্যারের লিখা বুঝতে হলে পাঠককুলকে শুধু হিমুর মত হলদে পাঞ্জাবী পড়ে খালি পায়ে হেঁটে বেড়ালেই হবেনা, বা চাঁদনী রাতে জ্যোৎস্না খুঁজে পথে বেরুলেই হবেনা। তার লিখা ও লিখার উদ্দেশ্য বুঝতে হলে পাঠককে সিম্বলজি, ইংলিশ লিটারেসি, গ্রিক মিথলজি পড়তে হবে। সাধারণের ভিতর অসাধারণ সৃষ্টির রহস্য জানতে হবে।

মনকে বুঝতে পেরেছে ক’জন! মনের গতি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাহিরে। হুমায়ূন আহমেদ হয়তো নিজের মনের গভীরে পৌঁছুতে পারেননি কখনো, তবে অগণিত পাঠককুলের মনকে জয় করে নিয়েছিলেন ঠিকই।আর তাইতো তিনি বলেছেন ”ঈশ্বর মানুষ কে প্রচুর ক্ষমতা দিয়েছেন, মনের কথা বুঝবার ক্ষমতা দেননি!”

কখনো তার লিখায় উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়, কখনো বা জীবনের সুন্দর দিক। ভাবুক কবি সময়ে অসময়ে তার একান্ত অনুভূতিগুলি ছুঁড়ে দিয়েছেন পাঠক হৃদয়ে।যখন তিনি বলতেন, ”আদিগন্ত বিস্তৃত শূন্যতায় কি বিপুল বিষণ্নতাই না অনুভব করি।জানালার ওপাশের অন্ধকার থেকে আমার সঙ্গীরা আমায় ডাকে। একদিন যাদের সঙ্গ পেয়ে আজ নিঃসঙ্গতায় ডুবছি …”, তখন একজন চিরসুখি জনও যেন নিঃসঙ্গতায় ডুবে যেতেন। আবার তিনিই পাঠককে হতাশা থেকে টেনে তুলে বলতেন, ”স্বপ্ন থাকা খুবই জরুরি…স্বপ্ন না থাকলে ভোরবেলায় ঘুম থেকে ওঠার কোনো মানেই হয় না…সারা জীবন শুয়ে থাকলেই তো হয়!”

তিনি যেন মানুষের প্রতিটা হৃদয়স্পন্দন শুনতে পারতেন! মানুষের ভাবনাগুলো নিয়ে খেলা করা যেন তার শখের আওতায় ছিল। স্যার এর মৃত্যুর পর, তার প্রিয় ছেলে নুহাশ মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা কিছু না বলা কথা ব্যাক্ত করতে গিয়ে বলেছিলেন, ”তিনি আমাকে ভালোবাসতেন। আমি নিশ্চিত, ভালোবাসতেন। হয়তো তাঁর মনোযোগ অন্যত্র সরে গেছে, হয়তো সুখ খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি, আর একা বোধ করেননি। কিন্তু এটা তো ঠিক যে কেউ কারও বিকল্প হতে পারে না। ভালোবাসা ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।”

এই লাইনগুলো যতবার পড়ি ততবারই মনে হয়, বাবার প্রতি নুহাশ এর অভিযোগ বা অভিমানের পরিমাণটা অনেক থাকলেও, ভালবাসার পরিমাণ ছিল তার থেকেও বেশী। আর তাইতো, বাবার লাশ দাফন করতে একমাত্র ছেলে গিয়েছিল হলুদ পাঞ্জাবী গায়ে বাবার কাল্পনিক চরিত্র হিমু সেজে। যেন কল্পনার হিমু সেবার সত্যিই বাস্তবে দেখা দিয়েছিল অন্তিম শয়নে শায়িত স্যার এর পাশে! ভালোবাসা কম হলে, নুহাশ হিমুকে হাজার হাজার মানুষ দেখতো কি? স্যারও হয়তো তা উপলদ্ধি করতে পেরেছিলেন। তাইতো তিনি বলেছেন, ”পৃথিবীতে অসংখ্য খারাপ মানুষ আছে কিন্তু একজনও খারাপ বাবা নাই”। তার ব্যাক্তিগত জীবন নিয়ে অনেক প্রশ্ন পাঠকের মনে! আমার মনে কখনও কোন প্রশ্নের উদয় হয়নি। হয়তো অন্ধ ভক্ত বলে! হয়তো বা তার লিখা, তার বিশেষ বিশেষ চরিত্রগুলো আমাকে প্রচন্ডভাবে আলোরিত করে বলে!

আমি স্যারকে ভালোবাসি একজন প্রতিভাবান লেখন হিসাবে, যার লিখায় ফুঁটে উঠে সাধারন মানুষের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার লড়াই। ফুটে উঠে সমাজের বিশৃঙ্খলতা আর বৈষম্য! ফুটে উঠে মধ্যবিত্তের আশা আকাঙ্খা, বেকার যুবকের উদাসীনতা আর ষোড়শীর অপ্রাপ্ত বয়সের ভয়ঙ্কর স্বপ্ন!

আমি তার ব্যাক্তিগত জীবন নিয়ে সমালোচনা করিনা। করতেও ইচ্ছুকও নই। ব্যক্তি হুমায়ূন আহমেদ এর সাথে আমার সখ্যতা নেই। আমি জানি শিল্পি হুমায়ূন আহমেদকে। তার পরিচয় আমার কাছে তার শিল্প, ব্যক্তিজীবন নয়। শুধু তিনি নন, মানুষ হিসাবে কারো ব্যক্তিগত জীবনেই দখলদারী করা, আমাদের জন্য সমীচিন নয়। স্বভাবে কম বেশী বৈপরীত্য আমাদেরও আছে।