বিদায় কালে হুমায়ুন আহমেদ

নিউ ইয়র্কের বেলভিউ হস্পিটালের ইনটেনসিভ কেয়ারে শুয়ে আছি। কত ঘন্টা ধরে ঠিক মনে করতে পারছিনা। সব কিছু কেমন স্বপ্নের মত লাগছে। এক ধরনের ঘোর মাথার ভিতর। বুঝতে পারছি,চিন্তা শক্তি সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
ইউনিটে আমার পাশে হতবাক দৃষ্টিতে জাফর বসে আছে। বার বার আমার গায়ে হাত দিয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে!
ঘর শুন্য হলেই জাফর আমাকে কি যেন বলার চেষ্টা করছে। মা এর কথা বলছে। রহস্যময় আমার এই চিকিৎসা পদ্বতি নিয়ে লিখার উৎসাহ দিচ্ছে। যেন আমি ছোট বাচ্চাটি কেউ। বার বার থেকে যাবার লোভ দেখাচ্ছে। সে লোভে আমার চোখ চকচক করে উঠছেনা। চোখের কোল বেয়ে বিন্দু বিন্দু মায়া গড়িয়ে পরছে!

আমার চার পাশে বিছানায় নানা ধরণের যন্ত্রপাতি । আমাকে বাঁচিয়ে তুলার সে কি আপ্রান চেষ্টা! জাফর বার বার নির্বোধের মত ডক্টরকে জিজ্ঞাসা করছে, “ধরুণ, যদি আমার ভাই এখন জেগে উঠে?’ ডক্টর ফ্যালফ্যাল করে তার মুখের দিকে তাকাচ্ছেন।
একজন মানুষ তার আসল গন্তব্যে চলে যাচ্ছে, তাকে ধরে রাখতে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান যে যথেস্ট নয়, সত্যটা যেন জাফরের মগজে যাচ্ছেই না।

এই মাত্র আমার অভিমানী মেয়ে বিপাসা এসে দেখে গেলো। আমার কেমন অসহায় লাগছিল। জগতের কোন অভিমানই যে একজন মেয়ের কাছ থেকে তার বাবাকে দূরে রাখতে পারেনা, আজ টের পেলাম! আচ্চা, কখনো কখনো মেয়েরা এত মায়াবতী হয় কেন ?

আমি মারা যাচ্ছি। আমার বোধশক্তি কমে যাচ্ছে। ব্লাড প্রেশার দ্রুত কমছে । মস্তিষ্কের নিউরন সেল ধীরে ধীরে মারা যেতে শুরু করেছে। মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ কমছে। ধীরে ধীরে তলিয়ে যেতে যেতেও আমি স্পষ্ট তাদের কথা শুনছিলাম। আমি অচেতন হয়ে পড়ে আছি উঁচু বিছানায়। অনেক কিছু বলার ছিল আপনজনদের। বলতে পারছিনা । ওরা আমাকে শান্তিনাশক ঔষদ শরীরে ঢুকিয়ে দিয়েছে। যাওয়ার সময় যেন কষ্ট না হয়। আমার কষ্ট হচ্ছে না । শুধু হৃদয়ে অনবরত রক্তক্ষরণ হচ্ছে! কি আশ্চর্য্য কেউ দেখছেনা !

শাওন অসহায়ের মত আহাজারী করে আমাকে আটকিয়ে রাখতে চাচ্ছে! ওকে শেষবারের মত বলতে ইচ্ছে করছে, ‘তুমিই আমার শেষ ভালবাসা। আমি চলে গেলেও, তোমার জন্য মন কাঁদবে শাওন’।
বলতে পারছিনা! আবারো হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।

গুলতেকিন কে বলা হলোনা অনেক কথা! আমার প্রথম প্রেম গুলতেকিন। আমার অনেক অসহায়ত্ব ও দূর্যোগের সাক্ষী গুলতেকিন। কি অপরিসীম মমতায় না ও আমাকে অন্ধকার থেকে আলোতে চলার পথ দেখিয়েছে ! হাতটি ধরে বলতে ইচ্ছে করছে ,”গুলতেকিন! আমার এক জীবনের ভালবাসার বিনিময়ে সব অভিমান ভুলে যেও। তোমায়ও কম ভালবাসিনি।’
আর কেউ না বুঝুক, আমার ছেলে নুহাশ বুঝে আমার লুকায়িত অভিমানী ভালবাসাটুকু। ওর চোখে দেখেছি আমি আমার প্রতি নীরব আত্মসমর্পন।

মাথার পাশে এক তরুনী নার্স দাঁড়িয়ে আছে। আমার শেষ মুহুর্তটি যেন কষ্টহীন হয়, তার নিশ্চয়তা দিতে আপ্রান চেষ্টা করে যাচ্ছেন। যে যন্ত্রপাতীগুলো এতদিন আমায় বাঁচিয়ে রেখেছিল, তা ক্রমশ স্থির হয়ে আসছে। ব্লাড প্রেশার আরও কমে এসেছে । সম্ভবত মস্তিষ্কের নিউরণ সেলগুলো সব ঘুমিয়ে পরেছে। আমিও ঘুমিয়ে পরছি ধীরে ধীরে। সব কিছু কেমন বাস্তব আর স্বপ্নের মাঝামাঝি দোল খাচ্ছে।
আমার হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত হতে লাগলো। বুঝতে পারছি, আমি হুমায়ুন চলে যাচ্ছি। আর কিছু সময় মাত্র।
আমার ভালবাসার মানুষ গুলো কেমন নিষ্ঠুরভাবে আমার চলে যাওয়ার মুহুর্তিটি দেখার জন্য অপেক্ষা করছে!
যে যন্ত্রটি এতদিন আমার হৃৎস্পন্দনকে স্পন্দিত করে আসছিল, তা এক মুহুর্তেই প্রচন্ড একটা ঝাকুনী খেয়ে থেমে গেলো। সারা মনিটর জুড়ে কেবল এক ভয়ংকর সরল রেখা স্থির হয়ে রইলো।
আমার দেহটি পরে রইলো ইউনিটের সাদা বিছানায়। যে মস্তিস্কটি এতদিন আমাকে একজন অসাধারন সৃষ্টিশীল মানুষ করে রেখেছিল পৃথিবীর বুকে, সেই মস্তিস্কটি চলে গেলো তার আপন ঠিকানায় ।
মায়া বড় ভয়ংকর জিনিস। যেতে যেতেও পিছু ডাকে।