সমীকরণে আ্যান নুয়্যেন

জীবন মানেই সমাধান আশান্বিত সমীকরণ! যার সমীকরণ মিলে যায়, জীবনের স্বার্থকতা সেই খুঁজে পায়। ব্যক্তি বিশেষে সমীকরণের ধরণ ভিন্ন হতে পারে, তবে ঘুরে ফিরে সেই একই বায়ুমন্ডলে আমরা। কখনো টিকে থাকার লড়াইয়ে, কখনো বা বিলীন হবার চেষ্টায় কীটপতঙ্গ, ইঁদুর, বিড়াল চেটে দেখছি।
সময়ের দাবীতে যখন আমাদের জীবনের উত্থানপতন ঘটে,তখন ব্যক্তিবিশেষে সমীকরণটাও হয়ে যায় অদ্ভূত। আমরা শেকড় উপড়ে হয়তো তখন সামনে বাড়তে থাকি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায়। আমরা ভুলে যাই অতীত, প্রিয় মুখ, প্রিয় সুখ। শুধু সামনে বাড়ার তাড়া; যদি জীবনের সমীকরণ মিলে যায়!
আসলেই কি সব কিছু ভুলে সামনে এগুলেই সমীকরণ যথাযথ হয়? কিংবা আদৌ কি অতীত ভুলা যায়?
এ নিয়ে কত কি কথা হলো তোমার সাথে। মনে পড়ে কি? তুমি বলতে, ‘যা চলে যায় তা অতীত। আর অতীতকে কখনো মনে রেখোনা! তাহলে সামনে এগুনো কষ্টদায়ক হবে।’
তুমি সত্যি বলতে।
তখন না বুঝলেও আজ বুঝতে পারি। বুকে পাথর চাপা কষ্ট নিয়ে খুব করে বুঝতে পারি।
তুমি এত নির্মম, জানা ছিলনা। চলে তো গেলে। কেনই বা গেলে, বলে ও গেলে না। পৃথিবীর তোমাকে খুব বেশী কিছু দেয়ার ছিল। তোমার ঋণ শোধ করা বাকি ছিল। এবাবে হুট করে কেউ চলে যায় বুঝি?
মনে পড়ে কি তোমার, ওই যে এপ্রিলের স্প্রিং, যার মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস ঘেঁষে তুমি আর আমি রাস্তারধারে কত বাহারী পাতা কুড়াতাম! মনে আছে সেই মার্টল আর সেনেকার রাস্তায় পালমেইট, সিনুয়্যেটে আর ট্রিপার্টাইট কুড়ানোর কথা? সবুজ, হলদে, লাল, বাদামী আরো কত রঙচটা পাতা জমা করতাম আমরা! তারপর গাছের ডাল কুড়িয়ে পাতা সংযোগ করে বাগান বানাতাম। পাতার বাগানে তুমি-আমি বানাতাম টিস্যু ফুল। তোমার সেই কি নির্মল হাসি দেখতে পেতাম তখন!
আমার আজ কত কি মনে পড়ে! তোমার নির্মল হাসি! স্বভাবে নম্রতায় মধুর স্বরে আমাকে ডাকা, তারপর নকশী কাঁথার বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে নির্মল ভালবাসার চিত্র, এত বদান্যতা কোথায় লুকিয়ে রাখি বলো!
শোন, তোমাকে বলা হয়নি এবারের স্প্রিং এর কথা! ওই যে তুমি, আমি সাইডওয়াকে পড়ে থাকা প্যালমেইট, সিনুয়্যেটে কুড়িয়ে নিতাম জামা ভরে।
ট্রিপারটাইট ছিল তোমার ভীষণ প্রিয়। স্কুল ব্যাকইয়ার্ডে যখন ওরা খেলতো, তুমি-আমি কুড়াতাম ট্রিপারটাইট ; জিপলগ ভর্তি করে। তুমি বলতে,
রিটা! ওই ওইল ম্যাক এ ডিফারেন্ট ডোর দ্যান আদার্স!
হ্যা! তুমি ডিফারেন্ট ডোর তৈরী করেছো একটা, তবে সেটা শুধু নিজের জন্য যেখানে আর কারো প্রবেশ নেই।
আ্যন নুয়্যেন, তোমাকে বলা হয়নি! এবারের পুরো স্প্রিংয়ে তোমার প্রিয় পাতাগুলো পড়ে ছিল রাস্তায়, বাতাস ওদের সরাতে পারেনি। আসলে বাতাসও তেমন ছিলনা সেদিন।
কি আশ্চর্য্য! বাতাসও সেদিন বুঝে গিয়েছিল হয়তো
নিঃশ্বাস যাতনায় তুমি একা; লড়ছো।
তোমার প্রিয় ট্রিপারটাইট, প্যালমেইট, সিনুয়্যেটে তারাও নড়েনি একদম। তোমার বিদায় বেলা, ওরাও হয়তো কাঁদছিল।
আচ্ছা! বলো তো, যেতে যেতে তুমি কিছু বলতে চেয়েছিলে কি? এই যেমন- স্প্রিং এর পাতা কুড়োনোর গল্প কিংবা অসমাপ্ত চিত্রশিল্পের কথা? কিংবা বলতে চেয়েছিলে কি, বুকে আজ নিঃশ্বাসের বড্ড অভাব? তুমি চলে গেলে..কেনই বা গেলে!
তুমি কি জানতেনা তুমি ছাড়া আজ নিউইয়র্কের আকাশে চাঁদ উঠেনা?
বলি তবে আজ শোন! তোমাকে আমি রোজ অনুভব করি। মধ্যরাতে তোমার অনাকাঙ্ক্ষিত নিঃশ্বাসটি আমার গা ঘেঁষে প্রবাহিত হয়ে যায়। প্রচন্ড বিতৃষ্ণা নিয়ে তলিয়ে যেতে যেতেও হঠাৎ তোমার অস্তিত্ব টের পাই। তীব্র অভিমানে চোখ টলটল করে উঠে। মনে হয় তোমার গলা চেপে ধরে বলি, নুয়্যেন! এই নুয়্যেন! তুমি কেন চলে গেলে? তুমি কি জানতেনা তোমাকে ছাড়া বাতাসও প্রাণহীন? তুমি কি জানতে না তোমাকে ছাড়া সাইপ্রেস আর ওডবাইন স্ট্রিটগুলো একেবারেই বিমর্ষ, একা?
জানতে তো! তুমি সব জানতে। তবু চলে গেলে। কেনই বা গেলে..!
আ্যন নুয়্যেন। রুক্ষ মাটিতে দুঃখ হয়ে গেঁথে গেলে তুমি। কুয়াশামোড়া নীরবতায় ঢেকে দিয়ে গেলে এই শহরের প্রাণের উচ্ছলতা। তুমি চলে গেলে, তো আঙুলের ডগা হতে পৃথিবী ছুটে গেল। তুমি চলে গেলে, তো জীবন ছুটে গেল জীবনের কাছ থেকে। ছিটকে পরলাম আমিও।
খুব দরকার কি ছিল?
বিদ্যুৎকে লোহার তার দিয়ে বাঁধানো মানুষ অতীতকেও বর্তমানে বন্দী করতে পেরেছে। সেই মানুষ কেন মৃত্যু শোককে দমিয়ে মনের আয়নায় বন্দী করতে পারেনি, বলো?
কত কিই তো শিখিয়ে গেলে নুয়্যেন! ইতিবাচক হওয়া, মানবিক, দায়ীত্বশীল, অন্যের প্রতি উদার হওয়া। আরো কত কি!
তোমাকে ভুলে যাবার কোন মন্ত্র কেন শিখিয়ে গেলেনা?
তুমি বড় স্বার্থপর নুয়্যেন।
তুমি চলে গেলে নিয়ইয়র্কের বুকে আঁধার ঘোষণা করে।