সন্তানদের প্রতি সিঙ্গেল মাদারের দায়িত্ব

আমরা যত আধুনিকই হই না কেন, এখনো আমাদের সমাজে সিঙ্গেল মাদার মানেই নানান প্রশ্ন। সিঙ্গেল মাদার মানেই যেন ব্যর্থতা। মাথার ওপর বটবৃক্ষ অর্থাৎ পাশে একজন পুরুষ ছাড়া সন্তানের জন্য নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা এবং পারিবারিক, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ গঠন যেন একেবারেই অসম্ভব। আমরা বুঝতে ব্যর্থ হই, প্রত্যেক নারীর জীবনে একজন পুরুষের ভূমিকা অপরিহার্য হলেও একজন পুরুষ ছাড়াও আমরা সাফল্য অর্জনের ক্ষমতা রাখি। সন্তানকে সঠিক পথ দেখাতে একজন মা-ই যথেষ্ট।

আমিও একজন সিঙ্গেল মাদার। একজন সিঙ্গেল মাদার হিসেবে এ পর্যন্ত আমি সাফল্যের সঙ্গে সন্তানদের যত্ন নিতে পেরেছি। সন্তানদের মৌলিক চাহিদা, যত্ন, সেবা, শিক্ষা, মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধ এবং তাদের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরেছি। বাবার অভাবটুকু খুব নিপুণভাবে পূরণ করতে পেরেছি। ‘ইফ আই হ্যাড অ্যা ড্যাড…!’ এমন অনুভব করার মতো কোনো সুযোগ আমি রাখিনি। সন্তানের পরিচর্যার পাশাপাশি নিউইয়র্কে আমি চাকরি এবং উচ্চশিক্ষা নিয়েছি। সহজ ছিল না, তবে অসম্ভবও ছিল না।

আমাদের মধ্যে অনেক সিঙ্গেল মাদার রয়েছেন, যাদের শক্তিশালী মনোবল ও সাহসী উদ্যোগ প্রশংসনীয়। আবার কেউ কেউ সিঙ্গেল মাদার হিসেবে সন্তানদের সঠিক পরিচর্যায় হিমশিম খান। তাদের জন্য নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আজকের এই লেখা। যদি কোনোভাবে কেউ উপকৃত হন।

সিঙ্গেল মাদার হিসেবে আপনার প্রথম দায়িত্ব, সন্তানের মানসিক ও বাহ্যিক আচরণ পর্যবেক্ষণ করা। একটি পুস্তকের মতো সন্তানকে পড়তে ও জানতে হবে। আপনার বিয়ে বিচ্ছেদ হয়েছে বা আলাদা থাকছেন, আপনি হতাশায় ভুগছেন—এসব বিষয় স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রাধান্য হলো, আপনার সন্তান এই নতুন পরিবর্তনটা কীভাবে নিচ্ছে তা অনুধাবন এবং পরিস্থিতি মানাতে সহায়তা করা। সন্তানের সঙ্গে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক থাকুন। নয়তো আপনার হতাশা, উদ্যোগ তাকে আরও হতাশ করবে।

সন্তানের সঙ্গে বিশ্বাস স্থাপন করুন। একটা বয়সে আমাদের সন্তানেরা কথা শুনতে চায় না। পরিবারে বাবা না থাকলে সেটা আরও প্রকট হয়। বন্ধু, পরিবেশে মেলামেশায় অনেক সময় তাঁরা ভালো-মন্দ বিবেচনায় রাখতে পারে না। তার ওপর পারিবারিক ভাঙনে তাঁরা আরও অনিরাপত্তায় ভোগে। তাই, অনেক দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে। এ ক্ষেত্রে সন্তানকে বুঝতে দিতে হবে, যেকোনো সমস্যা বা বিপদে আপনিই তাঁর নিরাপদ আশ্রয়। এতে করে আপনার সন্তান ঘরে-বাইরে ঘটে যাওয়া অনেক কিছু আপনার সঙ্গে শেয়ার করবে। এবং আপনি তাঁকে ভালো-মন্দ বিবেচনায় দিকনির্দেশনা দিতে পারবেন।

সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করুন। যেকোনো বিষয়ে সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করুন। পাশে থেকে তাঁর ভালো লাগা, মন্দ লাগা, সমস্যাসহ নানা বিষয় নিয়ে রোজ কথা বলুন। যেমন, স্কুলে কী হলো, বুলির শিকার হলো কিনা, মন খারাপ কিনা, পড়াশোনা, রেজাল্ট খারাপ হলে কী করণীয়, মন খারাপ কেন ইত্যাদি। সম্ভব হলে সপ্তাহে ১/২ বার রেস্টুরেন্টে গিয়ে উপভোগ করুন। থিয়েটার বা পার্কে নিয়ে যান। সর্বোপরি সন্তানকে অভয় দিন, ‘আই অ্যাম হিয়ার ফর ইউ, ডু নট ওয়্যারি।’

বাবার শূন্যস্থান পূরণ করুন। সন্তানের মুখে ‘আই ডোন্ট হ্যাভ অ্যা ড্যাড কিংবা ইফ মাই ড্যাড ওয়াজ হিয়ার’ জাতীয় বাক্য শোনা মায়ের জন্য খুব কষ্টকর ও চ্যালেঞ্জিং। তাই সন্তানকে বাবার অভাব বোধ করতে দেবেন না। বয়স ১৩/১৪-এর পর আপনার ছেলে সন্তানটির শরীরে হরমোনজনিত পরিবর্তন আসবে। নতুন শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে সে বিভ্রান্ত হতে পারে। কী করা উচিত বা কেন হচ্ছে—এসব বুঝতে না পারায় সে মুডি হতে পারে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যেতে পারে। এ ব্যাপারে যতটা সম্ভব সন্তানকে তাঁর শারীরিক পরিবর্তন সম্পর্কে বুঝিয়ে বলুন। এতে ইতস্তত হওয়ার কোনো কারণ নেই। সন্তান আপনার, আপনাকে তাঁর পাশে দাঁড়াতে হবে। দাঁড়ি-গোঁফ পরিষ্কার করতে প্রয়োজনীয় জিনিস তাঁর হাতের কাছে রাখুন। এ বয়সে অনেক বাচ্চাই এসব বিষয়ে মাকে বলতে লজ্জা পায়। বাবাদের সঙ্গে তাঁরা অনেকটা ফ্রি থাকে।

মেয়েদের শারীরিক পরিবর্তন অনেকটা নিজেরাই সামলে নেয়। তবু, প্রয়োজনীয় কোনো কিছু মিস করছেন কিনা, তা নজরে রাখুন। এ সময় মেয়ে সন্তানের ব্যবহারেও পরিবর্তন আসবে। সেটা বিবেচনায় রাখুন।

সন্তানকে দায়িত্বশীল হতে শেখান। সিঙ্গেল মাদারদের সব সময়ই উপার্জন ও খরচের ব্যাপারে খুব হিসাব কষে চলতে হয়। বাচ্চারা অনেক সময় অন্যের কিছু দেখে বায়না ধরে বা অপ্রয়োজনীয় আবদার করতে ভালোবাসে, যা একজন সিঙ্গেল মাদারের পক্ষে সব সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। বিষয়টি সিঙ্গেল মাদারকে বেশ আঘাত করে। তাই, সন্তানকে নিজের উপার্জন সম্পর্কে জানান। বাচ্চারা পরিবারে অধিকারী হতে পছন্দ করে। মাসিক খরচের একটা চার্ট তাকে করতে দিতে পারেন। কত উপার্জন হলো, এ মাসে কত খরচ হবে, কত বাকি থাকবে বা কত সংরক্ষণ থাকবে—তার হিসাব যখন আপনার ছোট বাচ্চাটিকে পাশে নিয়ে করবেন এবং কৌশলে তাকেও কিছু দায়িত্ব দেবেন, তখন আপনার সন্তান যোগ-বিয়োগের অংকে দক্ষ হয়ে উঠবে। নিজেই অপ্রয়োজনীয় জিনিসে অর্থ খরচ বা অহেতুক বায়না করা থেকে বিরত থাকবে। শিশুটি দেখে দেখে দায়িত্বশীল হবে। এটা আমার বেলায় খুব বেশি কার্যকর ছিল।

নিজেকে সম্মান করুন। কোনো পরিস্থিতিতেই বাচ্চারা বাবা-মায়ের বদনাম শুনতে পছন্দ করে না। বিশেষ করে বিচ্ছেদ বা বিবাহ বিচ্ছেদের পর কখনোই বাচ্চাদের কাছে নিজেকে সঠিক প্রমাণ করতে তাদের বাবা সম্পর্কে মন্দ কিছু বলবেন না। এতে আপনি সম্মান হারাবেন। বরং বাবার প্রতি তাদের সম্মান বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করুন। সন্তানের অপ্রয়োজনীয় চাহিদায় কখনোই রাগের বশে বলবেন না, ‘তোমার বাবার কাছে চাও।’ এটা তাদের ইমোশনালি খুব পীড়া দেয়। তাঁরা অসহায় ও নিঃসঙ্গবোধ করে। একটা সময় পর তারাই বুঝে নেবে, কে তাদের কতটা মূল্যায়ন বা ভালোবাসা বিলিয়েছে।

সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। প্রয়োজনে নিজের ব্যক্তিগত বিনোদনের কিছুটা সময় কেটে নিন তার বা তাদের জন্য। তাকে বা তাদের বুঝতে দিন, ‘ইউ আর দ্য মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট পারসন ইন মাই লাইফ।’ রোজ অন্তত একবার হলেও বলুন, ‘মম অর ড্যাড! আই লাভ ইউ!’ এতে আপনার সন্তানটি প্রাণোচ্ছল হয়ে উঠবে। রোজ যেকোনো কিছুতে প্রশংসা করতে ভুলবেন না।

সিঙ্গেল মাদাররা সব সময়ই শক্তিশালী হন। তাঁরা ধৈর্য, চেষ্টা, লক্ষ্য, পরিশ্রম ও সাহসের সঙ্গে সুখ, আনন্দ ও প্রাপ্তিতে সফল হন। উপরিউক্ত প্রতিটা বিষয় আমি প্রয়োগ করেছি নিজের বেলায় এবং উপকৃত হয়েছি। তবে একেকটা সন্তান একেক রকমের আবেগ, চিন্তা, বুদ্ধিমত্তা নিয়ে জন্মায়। প্রতিটি সিঙ্গেল মাদারের জীবনযাপন, ভাবনা ভিন্ন হয়। সবার জন্য একই প্রয়োগ কার্যকর নাও হতে পারে।

PA LINK