রাম হোটেলে একদিন

৩আমি তখন ইংল্যান্ডে। ব্যুরো অব এডুকেশনাল অ্যান্ড কালচারাল অ্যাফেয়ার্স (ইসিএ) সেমিনারে অংশ নিতে দুই সপ্তাহের ট্যুর। সেমিনার শেষে একদিন একাই বেরিয়ে গেলাম শহর দেখতে। ঘুরে ঘুরে পুরো শহর তছনছ করে ফেললাম। সন্ধ্যার মুখে হাঁপিয়ে উঠলাম। ট্যাক্সিতে করে রওনা হলাম ভালো কোনো হোটেলের খোঁজে।
অজানা, অচেনা শহরে কিছুই চিনি না। ট্যাক্সি ড্রাইভারের সহযোগিতায় এক হোটেল পেয়ে গেলাম, রাম হোটেল। নামটার গায়ে বেশ পরিচিত একটা গন্ধ পেলাম। তা ছাড়া শহর ছেড়ে খানিকটা দূরে হওয়ায় হোটেলের আশপাশটা বেশ ভালো লেগে গেল। তৎক্ষণাৎ হোটেলে উঠে পড়লাম।

রাতের ডিনার সেরে একটু আগেই সেদিন বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। মাথাটা খুব ঝিমঝিম করছিল। শোয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম, এমন ঘুম যেখানে আমি আর মৃত্যু একই সমান। ঠিক তখনই ঘুমের মাঝে মনে হলো, আমি হঠাৎ ভিন্ন কোনো জগতে ঢুকে পরলাম। মৃত্যুর রূপ বা তারও পরের জগৎটা দেখতে কেমন, তা আমার জানা নেই। তবে আমার হঠাৎ ঢুকে পড়া জগৎটা কেমন যেন মৃত্যুপুরীর মতোই ভয়ংকর মনে হচ্ছিল।

চারদিকে ঘুটঘুটে ভয়ানক অন্ধকার। এ অন্ধকারের সঙ্গে পৃথিবীর অন্ধকারের কোনো মিল নেই। চোখ খুলে তাকালেই ভীষণ আঁধার। বাইরে মট মট শব্দে মনে হলো, পরিণত কোনো ঢাল ভেঙে পড়ল। প্রচণ্ড শো শো শব্দ শুনতে পেলাম। এমন সময় হঠাৎ বিকট এক শব্দে ঘরের দরজাটা খুলে গেল। খোলা দরজা দিয়ে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর একটা লাল গোলাকার বৃত্ত ঘরে ঢুকে এগোতে লাগল আমার খাটের দিকে।
বৃত্তটি আমার ঠিক চোখের সামনে এসে মিলিয়ে গেল। আমার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল। প্রচণ্ড শীতের মাঝেও গা বেয়ে ঘাম ঝরতে লাগল। মনে হলো আমি বিছানার সঙ্গে লেপ্টে যাচ্ছি!
আচমকা এক তীব্র মিষ্টি গন্ধে ঘর ভরে গেল। গা গুলিয়ে উঠল। বমি ভাবটা প্রবল হতেই আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। আর তখনই মনে হলো, কিছু একটা ঠিক আমার মাথার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তার নিশ্বাস অনুভব করছি। কী ভয়ংকর! নাইট গাউনটা ততক্ষণে ভিজে চুপচুপা।
ধীরে ধীরে ছায়ামূর্তিটি আমার মুখের কাছটায় ঝুঁকে পড়ছে। ঘরের পর্দাটা শব্দ করে দুলছে। দ্রুত নিশ্বাসে আমার বুক ওঠানামা করতে লাগল। আচমকা একটা বিকট বিস্ফোরণে ঘর কাঁপিয়ে ছায়ামূর্তিটি বলে উঠল, ‘আমি মুক্তি চাই; তুমি আমায় মুক্তি দাও।’
এরপর ভয়ানক এক অস্থির অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হতে হতে আমি ঘুমে তলিয়ে যাই।

যখন ঘুম ভাঙল, তখন চোখ ধাঁধানো তীব্র আলোয় ঘর আলোকিত।
মাথা ঘুরিয়ে পাশ ফিরতেই চমকে উঠলাম। একি! এ যে আমাকে হোটেলে নামিয়ে দেওয়া সেই ট্যাক্সি ড্রাইভার দাঁড়িয়ে! বিমর্ষ ও বিধ্বস্ত শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। শীতল দৃষ্টি যেন অনেকটা মৃত মাছের ন্যায়।
ট্যাক্সি ড্রাইভার এবার আমার মুখের কাছটায় ঝুঁকে এল। আমি হতবাক কণ্ঠে বললাম,
-কী ব্যাপার! আপনি এখানে?
-জি ম্যাডাম।
-এখানে কি করছেন? সরে দাঁড়ান বলছি!
-আপনাকে একটা কথা বলতে চাই।
অস্থিরতায় বিহ্বল আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভয়ানক শান্ত কণ্ঠে ট্যাক্সি ড্রাইভার বলতে লাগল, ‘৫৬ বছর আগে আমার মৃত্যু হয়েছে। বহুদিন এই ঘরটার নিচে চাপা পড়ে আছি। আমি মুক্তি চাই। আমায় আপনি মুক্তি দিন।’
অস্থির অনুভূতি নাকি কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আমারও হল না। এক ঝটকায় সকল আলো ভীষণ আঁধারে রূপান্তরিত হতে হতে আমার চেতনা শূন্য হতে লাগল।
পরদিন নিজেকে আবিষ্কার করি হাসপাতালের বেডে। গলা শুকিয়ে কাঠ, তখনো জিহ্বা নাড়িয়ে কথা বলতে পারছি না। পাশে আমার কোচ প্রধান আতঙ্কিত দিশেহারা চোখে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখছেন। অজানা এক ভয়ে আমি আবারও চোখ বন্ধ করে ফেলি…।

* পরবর্তীতে জানতে পারি, ইংল্যান্ডের এই বহুল আলোচিত রাম হোটেল নাকি একটি কবরের ওপরে প্রতিষ্ঠিত। এই হোটেলটি ভুতুড়ে সব কর্মকাণ্ডের জন্য বেশ সমাদৃত।