বন্দুক যুদ্ধ, না ক্রস ফায়ার

১২ জুন, ২০১৬-

——————
ফয়জুল্লাহ ফাহিম, ঢাকার একটি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী। বয়স ১৯ বছর। ১২ জুন কলেজে তার একটি পরীক্ষা ছিল; কিন্তু তার আগের দিন অর্থাৎ ১১ জুন সে হঠাৎ নিখোঁজ হয়। এ ব্যাপারে তার বাবা ওমর ফারুক দক্ষিণখান থানায় একটি জিডি করেন।

১৫ জুন, ২০১৬-
——————
বুধবার বিকেলে মাদারীপুর সরকারি নাজিমউদ্দীন কলেজের প্রভাষক রিপন চক্রবর্তীকে তাঁর বাসায় ঢুকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টাকালে ফয়জুল্লাহ ফাহিম হাতে নাতে ধরা পরে। অতঃপর তাকে পুলিসের কাছে হস্থান্তর করা হয়। পুলিশের ভাষ্যমতে, ফাহিম শিবির করতো এবং একটা কোচিং সেন্টারের সাথে যুক্ত ছিলো। তার পকেটে ঢাকায় শিবির পরিচালিত রেটিনা কোচিংয়ের চাবি রয়েছে বলেও পুলিশ দাবি করেন। পুলিশের তথ্যমতে, ফাহিম ছিলেন নিষিদ্ধ আরেক সংগঠন হিযবুত তাহ্রীরের সদস্য।

১৮ জুন, ২০১৬-
——————-
জঙ্গি ফইজুল্লাহ ফাহিম হাতকড়া পরা অবস্থায় পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধ করে মারা যান। ঘটনার বিস্তারিত জানতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার মো: সরোয়ার হোসেন জানান, শনিবার সকাল ৭টা সাড়ে ৭টার দিকে পুলিশের একটি দল ফাহিমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সদর উপজেলার মিয়ারচর এলাকায় যায়। সেখানে একটি পাটক্ষেতের কাছাকাছি পৌছলে আসামির সহযোগিরা পুলিশের উপর গুলি বর্ষন শুরু করে এবং সুযোগ বুঝে ফাহিম পালনোর চেষ্টা করে। এ সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে ফাহিম আহত হয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করে ফাহিমকে নিয়ে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে আসে। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষনা করে।

জঙ্গি খ্যাত ফইজুল্লাহ ফাহিমের গল্পটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এখানেই শেষ হল বলে মনে করা হলেও, গল্পটির রেশ এখনো আছে।

কে এই ফইজুল্লাহ ফাহিম?
——————————
ফইজুল্লাহ ফাহিমের আসল বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ হলেও ২২ বছর ধরে তার পরিবার থাকে ঢাকায়। তার জন্মও ঢাকায়। রাজধানীর দক্ষিণখানে একটি পাঁচতলা বাড়ির দোতলায় থাকত তার পরিবার। ২০১৪ সালের এসএসসিতে পেয়েছিল জিপিএ ৫। ফাহিমের শ্রেণিশিক্ষক জানান, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে তার উপস্থিতি ছিল ৮০ শতাংশের বেশি। সে নিয়মিত নামাজ আদায় করত। পাড়ায় কোনো আড্ডাবাজিতে ছিল না। চুপচাপ লেখাপড়া করা ভদ্র টাইপ ছেলে ছিল ফাহিম। ওই শিক্ষক জানান, তার আচরণে কোনো উগ্রতা ছিল না। নিহত ফয়জুল্লাহ ফাহিম, শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছে ভালো ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিল।

কিছু প্রশ্নঃ
———-

১।ফাহিম উত্তরা হাই স্কুলের ছাত্র হয়ে কি করে মাদারীপুর গেলো?
২।মিয়ারচরের যে স্থানকে পুলিশ বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাস্থল হিসেবে দাবি করেছেন, ওই স্থানের লোকজন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ওইদিন ওই সময় তারা কোনো গোলাগুলীর শব্দ শোনেনি। (সূত্র: দৈনিক যুগান্তর ১৯ জুন ২০১৬) একটি গ্রামের ভেতরে বন্দুকযুদ্ধ হলো আর গ্রামের বা কাছাকাছি বাড়িঘরের কেউ সামান্যতম আওয়াজও শুনতে পেল না, এটা কী করে সম্ভব?
৩। ফয়জুল্লাহ ফাহিমকে ১৭ জুন বিকেলে রিমান্ডের জন্য যখন মাদারীপুরের আদালতে নেয়া হচ্ছিল, সে সময় পুলিশ নিরাপত্তার কারণে তার গায়ে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও মাথায় হেলমেট ছিল। কিন্তু শনিবার সকালে পুলিশ যখন বলল, ফাহিম বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে, তখন তাকে দেখা গেল সেন্টু গেঞ্জি ও হাতকড়া পরা অবস্থায়। প্রশ্ন হলো, আদালতে পুলিশ পাহারায় দিনের বেলায় অনেক কম ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে ও ফাহিমকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরানো হলো, কিন্তু যখন তাকে নিয়ে তার কথিত সহযোগীদের ধরতে কাক ডাকা ভোরে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে পুলিশ তাকে নিয়ে অভিযানে বের হলো, তখন কেন তাকে নেয়া হলো শুধু একটি স্যান্ডো গেঞ্জি পরিয়ে হেলমেট ছাড়াই?
৪। হাতকড়া পরা অবস্থায় কি করে পালানোর চেষ্টা করা যায়?
৫। তবে কি ধরে নেবো, এটা পুলিশী পূর্ব পরিকল্পিত হত্যাকান্ড যার দরুণ হত্যার সুবিধার্থেই ফাহিমকে জ্যাকেট-হেলমেট খুলে শুধু সাধারণ পোষাকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল?
৬। সারা দেশে ধারাবাহিক হত্যা ও হামলার জন্য পুলিশ মূলত দুটি জঙ্গি সংগঠন জেএমবি ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে দায়ী করে আসছেন। কিন্তু মাদারীপুর পুলিশ বলেছেন,ফয়জুল্লাহ ফাহিম নিষিদ্ধ আরেক সংগঠন হিযবুত তাহ্‌রীরের সঙ্গে যুক্ত। মাদারীপুরের পুলিশ সুপার সারওয়ার হোসেন প্রথম আলোকে এক বিবৃতিতে জানান, “পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ফয়জুল্লাহ বলেছেন যে তিনি হিযবুত তাহ্‌রীরের সঙ্গে জড়িত।” যদি তাই হয়, তবে কোথায় ফইজুল্লাহ ফাহিমের সেই ভয়েস রেকর্ড?
৯। পুলিশি তথ্যমতে, তার বুকের বাম পাশে দু’টি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। কেউ পালাতে চাইলে গুলি সাধারণত পিছন দিক হতে আসে; সামনে কেন?

যশোরের মুকুল রানা
——————————
আপনাদের কি যশোরের মুকুল রানার কথা মনে আছে? ১৯শে ফেব্রুয়ারী ২০১৫, মুকুল রানা যশোর সদর উপজেলার বসুন্দিয়া ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামের মাদ্রাসা পড়ুয়া এক মেয়েকে বিয়ে করেন। ২২ ফেব্রুয়ারি মুকুল রানা তার নব বিবাহিতা স্ত্রী নিয়ে শশুর বাড়িতে বেড়াতে যান। ২৩ শে ফেব্রুয়ারী শশুর বাড়ী হতে ফেরার পথে তাকে অপহরণ করে নিখোঁজ করা হয়। মুকুলের বাবা মো. আবুল কালাম আজাদ এবং স্ত্রী মহুয়া আক্তার প্রথম আলোর সাংবাদিকদের জানান, “২৩শে ফেব্রুয়ারী শশুর বাড়ী হতে ফেরার পথে, ডিবি পরিচয়ে একদল পুলিশ মুকুল রানাকে ধরে নিয়ে যান।” অতঃপর, এই মুকুল রানাই হঠাৎ নিখোঁজ হওয়ার ৪ মাস পর, অভিজিত্ রায় হত্যা মামলার ‘প্রধান আসামি’ এবং পুলিশের ভাষ্যমতে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের কথিত সদস্য শরীফুল ইসলাম, ওরফে মো. মুকুল রানা নামে গ্রেফতার হোন। তারপরের গল্প সবার জানা; সেই একি নিয়মে ১৮ জুন শনিবার রাতে রাজধানীর খিলগাঁওয়ে ডিবি পুলিশের সঙ্গে কথিত “বন্দুক যুদ্ধে ” নিহত হোন মুকুল রানা, যার অল্টারনেট ভার্শন- ক্রসফায়ার…..! অভিজিৎ রায়কে হত্যা করা হয় ২৬শে ফেব্রুয়ারী। তার আগেই ২৩শে ফেব্রুয়ারী আসামী ঠিক করে রাখা হয়!

এবং সেই একি কায়দায় পুলিশের ক্রসফায়ারের শিকার ফইজুল্লাহ ফাহিম। যদি ফাহিম আসামীই হয়ে থাকে, তবে তাকে ক্রসফায়ারে মারা কেন? সংখ্যালঘু একজন শিক্ষককে হত্যার চেষ্টায় গ্রেফতার হয়েছিল ফইজুল্লাহ ফাহিম। তাকে বাঁচিয়ে রাখলে, সংখ্যালঘুদের উপর অরাজকতা সৃষ্টিকারী মূল অপরাধীদের কি ধরা যেত না? নাকি সে এমন কোন তথ্য ফাঁস করেছিল, যাতে চলমান গুপ্তহত্যার সাথে কোনো গোয়েন্দা সংস্থার জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল? নাকি জঙ্গির পৃষ্ঠপোষক কারা, কারা জঙ্গি টিকিয়ে রেখে সুবিধা পেতে চাচ্ছেন, তা ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়েই ফাহিমকে উড়িয়ে দেয়া? হয়তো,যশোরের মুকুল রানার মতোই অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে ফইজুল্লাহ ফাহিমকে ছাত্র শিবির পরিচয়ে এ কাজ করতে বাধ্য করা করেছিল?

রিম্যান্ডে হত্যাকান্ডঃ দায়ী কে?
————————————-
আরো একটি বিষয় নিয়ে আমরা অনেকেই ভাবিনা, তা হলো- রিমান্ডে থাকা অবস্থায় কেউ হত্যাকান্ডের শিকার হলে এর জন্য দায়ী কে? রিমান্ড মানেই হল আইনে অধীনে পুলিশের হেফাজতে থাকা। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৭ ধারার অধীনে জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আসামীকে পুলিশ হেফাজতে দিয়ে থাকেন নিজেদের জিম্মায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে সঠিক তথ্য বের করার জন্য। আইনের হাতে সোপর্দ হওয়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জিম্মাদার হল আদালত। আদালতের নির্দেশেই জামিন মঞ্জুর হয়, আদালতের নির্দেশেই কারাগারে পাঠানো হয় এবং আদালতের নির্দেশেই রিমান্ডে পুলিশের জিম্মায় আসামীকে দেয়া হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, রিমান্ডে নেয়া আসামী পুলিশ হেফাজতে খুন হলে, আদালত কি হত্যাকান্ডের দায় এড়াতে পারেন? ১০ দিনের রিমান্ডে নেয়া ফইজুল্লাহ ফাহিমকে প্রথম দিনেই বন্দুক যুদ্ধ নামে ক্রসফায়ারে উড়িয়ে দেয়া হয়; এর দ্বায়ভার কি আদালত এড়িয়ে যাবেন? বাংলাদেশে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, রিমান্ডের সময় আসামীর আইনজীবী বা পরিচিত কারো উপস্থিতির বিধান থাকলেও সেই নিয়মটি মানা হচ্ছে না, কিংবা বলা যায়, মানতে দিচ্ছে না।

পরিশেষেঃ
———–
দেশ হতে জঙ্গি নিধনে যারা আসামীদের আটক করে “বন্ধুক যুদ্ধে নিহত” গল্পগুলো বানাচ্ছেন, তারা খুব অদক্ষ গল্পকার। বাঙ্গালী জাতি চিরকালই বেশী বুঝায় অভ্যস্ত; ভুলে যাবেন না। রিমান্ডে থাকা অবস্থায় আসামীর মৃত্যু হলে,সেটাকে আড়াল করতেই যে বন্দুকযুদ্ধ নামক নাটক সাজানো হয়, তা জনতা জানেন। তবে আফসোসের বিষয় হচ্ছে, যেখানে ফ্রান্সে বোমাবাজির ঘটনায় একজন সন্দেহভাজনকে জীবিত অবস্থায় গ্রেপ্তারের জন্য মাসের পর মাস ইউরোপব্যাপী অতিসতর্ক অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ, সেখানে আমরা জঙ্গিবিরোধী অভিযানে সাফল্যের জন্য দেশ ও দশের বিন্দুমাত্র পরোয়া করিনা; আমরা নিজেদের বাঁচাতে অতি প্রয়োজনীয় ফয়জুল্লাহদের মত সাক্ষ্যগুলোকে ক্রসফায়ারে উড়িয়ে দেই, কিংবা নিজেদের স্বার্থে নিরীহ কোন মানুষকে নাটকের হিরো বানিয়ে গল্পের ইতি টানি।
এখন আমাদের নিরাপদ থাকাই দুস্কর। কখন কে হয়ে যায় বলির পাঠা! হয়তো একদিন হুট করে আপনাকে গুম বাহিনী তুলে নিয়ে যাবে, তারপর চলবে মাসব্যাপী নির্যাতন! একদিন আপনাকে মুক্তিপণ চাওয়া হবে কোন হিন্দু শিক্ষকের খুন কিংবা খ্রিষ্টান দর্জির হত্যার বিনিময়ে। যদি ভালোভাবে হত্যা মিশন সমাপ্ত করতে পারেন তবে আপনার মুক্তি নিশ্চিত।যদি জনতার হাতে ধরা পড়েন, তাহলে সাবধান; তাহলে আপনিও এভাবেই ক্রস ফায়ারে মারা যাবেন!

আমাদের দেশ, আমাদের রাজনীতি ভয়াবহ রুপ ধারণ করেছে! কারো মুক্তি নেই!