উনত্রিশে এপ্রিল

একটি প্রাণ ঝরে গিয়েছিলো সেদিন এপ্রিলের ভ্যাপসা গরমে
চারিদিকে হট্টগোল, প্রতিবাদ মিছিলে সড়ক মহাসড়ক বিক্ষিপ্ত
দলে দলে স্বজনের আক্ষেপ, হিতৈষীর চোখে আখেরাতের ব্যাপক প্রাপ্তি
“লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ্”-
সব ভাল মন্দের হিসাব নিবেন দয়াময় আল্লাহ,
এমন শহীদি মৃত্যু কার ভাগ্যে জোটে?
মাটি চাপা দিয়ে এবার শুকরিয়া আদায়ের পালা
ওদিকে লক্ষ মানুষের ভিড়ে জীবন্ত কিছু লাশ পড়েছিলো অনাদরে
কেউ দেখেনি, কেউ বোঝেনি;
বাড়ন্ত শিশুটি নির্বাক দাঁড়িয়ে ছিলো দূরে।
 
শিশুটি চিৎকার করে, এদিক ওদিক ছুটে
অতঃপর শূন্য দৃষ্টিতে ভয়ানক মৃত্যুকে দেখে
তার দেহ ভিন্নভিন্ন অজস্র গুলিতে,
এলোপাথারি চাপাতির কোপে মাংস খুলে খুলে পড়ে
হাতের ঘড়িটি পড়ে ছিলো দূরে, রক্তের মোহর চকচকা বেল্টটি
জুড়ে
শিশুটি ভাবে,আহা! কি স্বচ্ছ জলের রং; লালে লালে অপূর্ব সন্মোহন।
 
কেউ জানলোনা হাতের মেহেদী তখনো রং ছাড়েনি নববধূর
দাফনের সাথে কাফনের কাপড় জুড়ে দিল গায়ে,
নাকফুল ছুটে গেল লক্ষ নিয়মের ভিড়ে, কেউ দেখলোনা
চুড়ান্ত অন্ধকারে, নীরব গোঙানিতে তার হৃদয়ে ক্ষণে ক্ষণে রক্ত ঝরে।
 
পিতা ছিলো নির্বাক, শোকের চাদর গায়ে জড়ায়ে
এ যেন শ্রেষ্ঠ অভিশাপ; পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ
কেউ দেখলনা কি ভীষণ তাপে মাতার স্তনযুগল বিষে টনটনিয়ে উঠে,
শূন্য চোখে কেবল তার হাহাকার,
বুকের পাঁজর ভেদে বাঁধভাঙ্গা জলপ্রপাত ছুটে যেতে চায়
অথচ কি নিবিড় আলিঙ্গনে নাড়ির বাঁধন দিল খুলে।
 
রাতের প্রসব শেষে ভোরের আলো
আর আসেনি কোনদিন ক’টা মানুষের জীবনপটে
শিশুটির শীতল চোখে আজো মৃত্যু এসে হানা দেয় প্রতিরাতে
লালে লালে বিছানা রক্তে ভেসে যায়, রক্তপুকুরে হাঁটু জল নেমে
রক্তস্নানে প্রতি প্রাতে বিশুদ্ধ হতে চায়!
আহ! কি কষ্ট! কি কষ্ট!
হিমালয় বুকে ধরে পাষাণী বলে, “কাঁদিসনে তুই আর কাঁদিসনে”!
নাট্যশালায় কত মুখরোচক অভিনয়, জীবন্ত আগুন বুকে বেঁচে থাকার অনুনয়!
 
হ্যাঁ, সেই শিশুটি আমি! আমিই সেই শীতল মোহিনী যার মৃত্যু হয় প্রতি রাতে
অবিরাম আত্মরক্ষায় বড় বেশী ছদ্মবেশী আগন্তুক
বলি, আর পারিনা;
সমাধিকরণ যদি মুক্তি হয়, তবে দাফন করে দাও আমাকে
ল্যাটা চুকে যাক!
মগজ গলে গলে পরে প্রতি রাতে
দিনের আলোয় মুঠি করে গলিত মগজ ঠেসে দেই খুলিতে
অস্থির হই
তার মৃত্যুতে নয়,
আমার অসহায় চোখের অক্ষমতা তাকে কতটা পীড়া দিয়েছিল তাই ভেবে!
কেবল ভাবি
ভেবে ভেবে শীতল মৃত্যু আমায় আলিঙ্গন করে প্রতি রাতে!
অতঃপর, মৃত চোখে চেয়ে দেখি সেই পুরনো হাহাকার
মানুষের হট্টগোলে অনর্থক কিছু প্রলাপ
টের পাই; অদৃশ্য বিস্ফোরণে বিষ ছড়ায় শরীরে!
 
প্রতি রাতে মনে হয়,
কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে অন্ধকারের ভিতর
অস্পৃশ্য একটি ছায়া গা ঘেঁষে থাকে রাত্রি গভীর হলে
যে যায় সে কি বুঝে মৃত সম্পর্কের বোঝা কত দুর্বিসহ?
 
কেউ দেখেনি,
বহু বছর আগে প্রচন্ড গরমে ঘটে যাওয়া একটি মৃত্যু
জন্ম দিয়েছিল আরো কিছু আজন্ম শীতল মৃত্যুর।
আমি সমাধি চাই,
কেউ আমায় মুক্তি দাও; কেউ আমায় সাড়ে তিন হাত মাটি ভিক্ষে দাও।