আদিকাল থেকেই সমাজে ‘রক্ষিতা’ শব্দের প্রচলন  

 

এইচ বি রিতা

সম্প্রতি রাজধানীর গুলশান এলাকার একটি ফ্ল্যাট মুনিয়া নামের এক কলেজ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনাটির পর থেকে, সোস্যাল মিডিয়া এবং ব্যক্তিবিশেষে মেয়েটিকে বলা হচ্ছে ‘বেশ্যা/ রক্ষিতা।‘

কেন বলছেন? কারণ মেয়েটি বিবাহ ছাড়া বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীরের সাথে লিভটুগেদার করেছিলেন। তাই অনেকের মতে, মেয়েটির আত্মহত্যা (যদিও এটাকে আমি হত্যা বলব) নিয়ে বিচার চাওয়ার কিছু নেই।

যারা মেয়েটিকে ‘বেশ্যা’ বলছেন, তাদের সর্ব  প্রথম বেশ্যার সংজ্ঞা জানা দরকার।

 

বেশ্যা কারা বা কাকে বলে?

যে সকল নারীরা পেশা হিসেবে নিজের শরীরকে অন্যের যৌন লিপ্সা মেটানোর জন্য দান করেন, কিংবা অর্থের বিনিময়ে অন্যকেযৌন তৃপ্তি দেন, আমাদের সমাজের ভাষায় তারা ‘বেশ্যা’। সেই বেশ্যারা কিন্তু একগামীতায় পড়েনা, তারা হয় বহুগামী; অবশ্যয়ইআর্থিক প্রয়োজনে।

জর্জ রালি স্কট তাঁর ‘পতিতা বৃত্তির ইতিহাস’ নামক বইটিতে (A history of prostitution from antiquity to the present day) পতিতাবৃত্তির সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে – “পতিতা অর্থাৎ বেশ্যারা হলো সেই সম্প্রদায় ভুক্ত নারী যাঁরা পুরুষকে যৌন সুখ ভোগ করাতে নিজেদের দেহ দিয়ে – জীবিকা অর্জন করে।”  তবে তিনি তার বইতে আরো এক শ্রেনির পতিতার কথা বলেছেন, যাঁরা অর্থ ছাড়াই পুরুষদের সাথে যৌন সম্পর্ক করে তাঁদেরকে তিনি Amateur Prostitutes অর্থাৎ ‘পেশাহীন পতিতা’ বলে অভিহিত করেছেন।

এবং আমরা অনাকাঙ্খিত মৃত্যুতে বিদায় নেয়া যে মেয়েটাকে ‘বেশ্যা’ বলছি, সে মূলত বেশ্যার কোন সংজ্ঞায় পড়েনা। সে সম্পর্ক করেছিল। প্রেম বিনিময় করেছিল। এক সাথে থেকেছিল। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনায় নিলে, সেটা ভিন্ন  ব্যাপার, আমি সেদিকে যাচ্ছি না।

 

মুনিয়ারা  ‘বেশ্যা’ হলে আনভীররা ‘ডার্টি বেশ্যা বয়।”

এই বেশ্যার উপাধীটি কিন্তু আমাদের(পুরুষ) অবদানেই আসে। বেশ্যা ও বেশ্যাবৃত্তি পৃথিবীর সকল জাতির, সকল দেশের ইতিহাসের অবিচ্ছদ্য একটি অংশ। আমরা মুখে যতই ধর্ম, সংস্কৃতি, নীতিমালা আওরাই না কেন, বেশ্যালয় আমাদের দরকার আছে। ইতিহাসের পাতা ঘাটলে দেখা যাবে, রাজা-বাদশা-সম্রাট-উজির-নাজির-গোমেস্তা থেকে শুরু করে ধর্মযাজক-ধর্মপ্রচারকদের অনেকেরই বেশ্যা লাগত সে সময়টাতে। এবং এখনও ক্ষমতাধর থেকে শুরু করে ক্ষমতাহীন, উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিন্মবিত্ত অনেকেরই বেশ্যা লাগে।

আর এই ‘অনেকেরই’ যে ‘বেশ্যা’ লাগে, তারা কারা?  তারাই আমি, আপনি, আমরা। অর্থাৎ, কোন নারী একা একা বেশ্যা হতে পারেন না। তাদেরকে বেশ্যা বানাতে আমাদের(পুরুষ) অবদান রয়েছে।

তাহলে, বেশ্যা শব্দটি শুধু নারীর বেলায় কেন? বেশ্যাদের কাছে যে সব পুরুষদের যাতায়াত, তাদের অধিকাংশই বিবাহিত। অর্থাৎ তারাও বহুগামী। আনভির কিন্তু ঘরে স্ত্রী রেখে মুনিয়ার কাছে গিয়েছিলেন। তিনিও বহুগামী। সমাজের ভাষায় বলতে হলে, আনভিরও ‘বেশ্যা।’

বাহিরের দেশে টাকা বা স্বার্থের বিনিময়ে যে সব ছেলেরা বয়স্ক নারীদের সাথে রাত কাটান- তাদের বলে ‘গিগোলো!’ মোটামোটিবয়সের ছেলে দেহ ব্যবসায়ীদের বলা হয়-রেন্ট বয়। উগ্রতা-চতুরতায় কিছু হাসিল করার ব্যাপারে কেউ কেউ ‘হেসলার’ শব্দটিওব্যবহার করেন। শুধুমাত্র বাংলাদেশের ডিকশোনারীতে এদের কোন উপাধী নেই। কারণ বাংলায় সবই সোনার ছেলে। তবে, যেহেতু আনভীরের মত বহু মানুষ অর্থ উপার্জনে নয়, স্বার্থভোগে বেশ্যা বা মুনিরার মত মেয়েদের প্রেমের প্রতারণায় ফেলে ভোগ করতেযান, সেক্ষেত্রে  আমরা তাদের নাম দিতে পারি, ‘ডার্টি বেশ্যা বয়!’

 

সমাজে নারীদের পণ্যরুপে আগমন  বা ব্যবহার কবে থেকে?

সমাজে নারীদের বেশ্যাবৃত্তি আজ নতুন কিছু নয়। অর্থ,আশ্রয়ের বিনিময়ে যৌনতা বিক্রি, বা বাধ্য করার ইতিহাস সুপ্রাচীন। ইতিহাসবিদ ভিন্টারনিৎসের মতে ঋগবেদের প্রথম মণ্ডলের ১২৬তম সূক্তের অন্তর্গত পঞ্চম ঋকে যে “বিশ্যা” (“সুবন্ধবো যে বিশ্যা ইব ব্রা অনস্বন্তঃ স্রব ঐযন্ত পূযা”) শব্দটি আছে তার থেকেই  “বেশ্যা” কথাটির উৎপত্তি।

ওয়েবস্টার অভিধান মতে, সুমেরিয়ানদের মধ্যেই প্রথম পবিত্র পতিতার দেখা মেলে। প্রাচীন গ্রন্থাদিসূত্রে, যেমন ইতিহাসের জনক হিসাবে খ্যাত হিরোডেটাস (খ্রিস্টপূর্ব ৪৮৪ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৪৩০/২০)-এর লেখায় এই পবিত্র বেশ্যাবৃত্তির প্রচুর উদাহরণ পাওয়া যাবে, যেটি প্রথম শুরু হয়েছিল ব্যাবিলনে। সেখানে প্রত্যেক নারীকে বছরে অন্তত একবার করে যৌনতা, উর্বরতা ও সৌন্দর্যের দেবী আফ্রোদিতির মন্দিরে যেতে হত এবং সেবাশুশ্রূষার নমুনা হিসাবে নামমাত্র মূল্যে যৌনসঙ্গম করতে হত একজন বিদেশির সঙ্গে।

এরকমই বেশ্যাবৃত্তির চর্চা হত সাইপ্রাস এবং করিন্থেও। এটি বিস্তৃত হয়েছিল সার্দিনিয়া এবং কিছু ফিনিশীয় সংস্কৃতিতে, বিশেষ করে ইস্টার দেবতার সম্মানে। ফিনিশীয়দের মাধ্যমে ক্রমশ এটি ভূমধ্যসাগরের অন্যান্য বন্দর শহরগুলিতেও সংক্রমিত হয়, যেমন সিসিলি, ক্রটন, রোসানো ভাগলিও, সিক্কা ভেনেরিয়া এবং অন্যান্য শহরে। এক্ষেত্রে অনুমান করা হয় এশিয়া মাইনর, লাইদিয়া, সিরিয়া ও এট্রাকসনের প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সমাজে বেশ্যা বা পতিতারা ছিলেন স্বাধীন।

বেশ্যাদের অসংখ্য নামে ডাকা হতো ইতিহাসের আদিকাল থেকেই যেমন –পতিতা , বারাঙ্গনা,দেহপসারিণী, দহপোজীবিনী, রক্ষিতা, খানকি, বারবনিতা, উপপত্নী, জারিণী, সাধারণী, মহানগ্নী, পুংশ্চলী, পুংশ্চলূ,অতীত্বরী, বিজর্জরা, অসোগু, অতিষ্কদ্বরী, গণিকা এবং হাল আমলের যৌনকর্মীও বোঝায়।

‘আইয়্যামে জাহেলিয়া’ যুগে আরবে পতিতাবৃত্তি সহ আরো অনেক খারাপ কাজ চালু ছিল। ইতিহাসবিদ পি.কে হিট্টি বলেন, ‘মহানবী (সাঃ) এর আবির্ভাবের একশ বছর আগে আইয়্যামে জাহিলিয়া শুরু হয়।’

প্রাচীন ভারতে এক সময় বেশ্যাদের বলা হত ‘গণিকা।’  বার্ষিক একটা নির্দিষ্ট বেতন দিয়ে রাজা-বাদসারা তাঁদের প্রাসাদে গণিকাদের নিয়োগ করতেন। তাদের আয়ের একটা অংশ “কর” হিসাবে রাজ্য কোশাগারে জমা হত। প্রাচীন ভারতে গণিকা বা বেশ্যাদের  রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হিসাবে গণ্য করা হত। এবং বেশ্যাদের ঘরে বহু জ্ঞানী-গুণীদের আলোচনা-সভা বসত।

ভক্তমূলক পতিতাবৃত্তি অর্থাৎ দেবদাসী প্রথার কথা আমরা সকলেই জানি। এটি এক ধরনের সামাজিক রীতি যেখানে একজন মানুষ নিজ পতি বা পত্নী ব্যতীত অন্য কারও সাথে পবিত্র বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে যৌন সঙ্গম করে। এ ধরনের কাজে জড়িত মহিলা দেবদাসী বা ধর্মীয় গণিকা বলে পরিচিতি পায়।  এক সময় শিল্পকর্মে পারদর্শিন দেবদাসীদের বলা হত কলাবন্তী । তারা অভিজাত শ্রেণির দ্বারা মন্দির রক্ষণাবেক্ষণের কাছে নিযুক্ত হতেন। সেখানে মন্দিরের মেঝে ঝাড়ু দেওয়া, পবিত্র প্রদীপে তেল ঢালা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, পূজামন্ডপে ও ধর্মীয় শোভাযাত্রায় নৃত্যগীত পরিবেশন করা এবং পূজার সময় প্রতিমাকে বাতাস করা থাকত তাদের কাজ।

এই কাজের জন্য তাদেরকে মন্দিরের তহবিল থেকে সামান্য কিছু দেয়া হত। সেটা তাদের তাদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট ছিলনা। তাই  জীবিকা অর্জনে তাদেরকে  ভক্তিমূলক পতিতাবৃত্তি (Sacred prostitution) করতে তারা বাধ্য হতো। এই প্রথা এখনো চালু আছে। মূলত এই দেবদাসী প্রথার আধিপত্য ছিল দাক্ষিণাত্যে। সেখানে রাজারা কোন অনুষ্ঠানে কয়েকশ দেবদাসী দান করতেন মন্দিরে।

প্রাচীন গ্রিস, এথেন্স ও রোমে বহু বছর আগেই পতিতা বৃত্তি চালু হয়েছিল। এমনকি সেসময় অনেককে বাধ্য করা হতো পতিতাবৃত্তি করতে। ইউস্তিয়ানের স্ত্রী রোমক সম্রাজ্ঞী থেওডেরো প্রথম জীবনে বেশ্যা ছিলেন। পৃথিবীতে প্রথম বেশ্যাবৃত্তি পেশার মতো লাইসেন্স বা নিবন্ধন দেওয়া ও কর ধার্য করা হয় রোমান আমলেই। (তথ্যসূত্র: Thomas A. McGinn, The Economy of Prostitution in the Roman World, 2004)

এথেন্সের আইন প্রণেতা ও কবি সোলোন (খ্ৰী.পূ. ৬৩৮ – খ্ৰী.পূ. ৫৫৮) যিনি প্রাচীন গ্রিকের তৎকালীন সাতজন জ্ঞানী লোকের একজন হিসাবে গণ্য হতেন, তিনি খ্রিস্টপূর্ব ছয় শতকে এথেন্সে প্রথম বেশ্যালয় স্থাপন করেন। (তথ্যসূত্র: Cf. Herodotus, Book I, para 199)

চীনে পতিতাবৃত্তির ইতিহাস সুপ্রাচীন। ‘Fang Fu Ruan’ তাঁর লেখা ‘Sex in China’ বইয়ে লিখেছেন, “Ying-chi is the first independent prostitutes in Chinese history …” অর্থাৎ ‘Yang chi’ চীনের ইতিহাসে প্রথম স্বাধীন পতিতা। তাঁর খদ্দের ছিল, উচ্চ শ্রেনির ব্যাক্তিবর্গ। এছাড়া চিনে Tang (তাং) রাজবংশ একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বেশ্যাবৃত্তি চালু করেছিল। পরবর্তী Shang (সাঙ) রাজবংশ বিভিন্ন স্থান থেকে পতিতাদের সংগ্রহ করে ‘হাঙ চৌ’ শহরে বসবাসের ব্যবস্থা করে ফলে সেখানে বড় মাপের পতিতালয় তৈরি হয়। (তথ্যসূত্র: Sex in China; Fang Fu Ruan; Springer Science & Business Media, 31st Oct. 1991)

বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী,  প্রাচীনকালে বহুভোগ্যা নারীদের কাজ যদিও ছিল একই, শরীর বিক্রি করা, তবু বেশ্যাবৃত্তির চরিত্রানুসারে তাদের নানাবিধ নামে উল্লেখ করা হত।  প্রাচীনকালে “গণিকা” বলতে বোঝাত বহুভোগ্যা নারীকেই, অর্থাৎ দল বা দলবদ্ধ হয়ে যে নারী যাপন করে তিনিই গণিকা। যে নারী বেশ বা সাজসজ্জা দ্বারা পুরুষদের প্ররোচিত বা প্রলোভিত করে তাদের বলা হত ‘বেশ্যা’। আবার ‘বেশ’ শব্দের আদি অর্থ হল বাসস্থান, এই বিশেষ বাসস্থানে যে নারী বাস করেন তিনিই বেশ্যা। পণের বাজি রেখে সম্ভোগ করা নারীদের “পণ্যাঙ্গনা” বলা হত।  ‘বারস্ত্রী’ তাঁরাই, যে নারীরা যুগপৎ মন্দিরের সেবাদাসী ও রাজা বা অমাত্য মর্যাদার রাজকর্মচারীদের ভোগ্যা হতেন। পরিচারিকা বা ক্রীতদাসী রক্ষিতারা হলেন “ভুজিয়া”। যে নারীর চরিত্রের পতন হয়েছে তিনি “পতিতা” ইত্যাদি।

 

এবার দেখি ‘রক্ষিতা’ কি?

রক্ষিতা অর্থ প্রতিপালিতা, উপপত্নী। অর্থাৎ যাকে ভরণ-পোষণ-নিরাপত্তা দিয়ে রক্ষা করা হয় সেই-ই রক্ষিতা।

রক্ষিতা বা উপপত্নী গ্রহণের অনুশীলন চীন থেকে শুরু হয়েছিল বলে মনে করা হলেও, মূলত উপপত্নী গ্রহণের অনুশীলন হাজারো বছর পূর্বে প্রাচীন মেসোপটেমিয়া এবং ব্যাবিলোনিয়ার সভ্যতায়ও দেখা যায়।  প্রাচীনকালের রাজা বাদশাদের জন্য রক্ষিতা ছিল সাধারণ বিষয়।  হারেম, যার অর্থ অন্তঃপুর, অন্দরমহল, জেনানামহল, নিষিদ্ধ বা পবিত্র স্থান, সেখানে অবস্থান করতেন রাজা, সুলতান বা সম্রাটের স্ত্রীরা, উপপত্নীরা, অপ্রাপ্ত বয়স্ক পুত্র, অবিবাহিত কন্যা, মহিলা আত্মীয় এবং দাসীরা। এখানে রাজা বা রাজপুত্রদের বিনোদনের জন্য থাকত শত শত যুবতী নারীরা। যে রাজা যত বেশি অভিজাত, ক্ষমতাশালী ও অর্থবিত্তের অধিকারী তার হারেমে নারীর সংখ্যাও তত বেশি থাকত। নারীদের পবিত্র স্থান হারেমে  রাজা বা রাজপুত্র ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ ছিল।

সেই আমলে যুদ্ধ সব সময় লেগেই থাকত। যুদ্ধে পরাজিত নারীদের দাসী হিসেবে, কখনো বিয়ে কিংবা উপঢৌকন হিসেবে হারেমে নিয়ে আসা হতো। অনেককে দাসী হিসাবে কিনে আনা হত। এরা সবাই রাজা বা সম্রাটের উপপত্নী হিসেবেই সারা জীবন কাটিয়ে দিত। ভাগ্য ভাল হলে কেউ কেউ রাজার স্ত্রী হওয়ার সুযোগ পেত।

যদিও বর্তমানে খ্রিস্টান ধর্মে রক্ষিতা বা উপপত্নী গ্রহণযোগ্য নয়, তবে ইহুদী ধর্মেও উপপত্নীর অনুমতি ছিল। ইহুদি চিন্তাবিদ মাইমোনাইডস বিশ্বাস করেন, উপপত্নীদের রাজাদের জন্য কঠোরভাবে সংরক্ষিত করে রাখা হত। ইসরাইলের প্রথম এবং গুরুত্বপূর্ন রাজা সম্রাট সলোমনের (১০১১-৯৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) ৭০০ স্ত্রী ছাড়াও ৩০০ উপপত্নী ছিল বলে জানা যায়।

এক সময় ইসলাম ধর্মেও ইসলামী নিয়ম ও শাসনের অধীনে, যুদ্ধবন্দী হিসাবে গৃহীত অমুসলিম নারী এবং  ক্রীতদাস হিসেবে মূল্য দিয়ে ক্রয় করা নারীদের উপপত্নী বা রক্ষিতা হিসাবে গ্রহণের অনুমতি ছিল।  প্রাক-ইসলামিক যুগে দাসী ক্রয় বিক্রয়ের একটি সামাজিক আইন ছিল। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর সেই দাস নারীদের মুক্ত করা বা বিয়ের অনুমতি দেয়।

বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, মুগল ও সুলতানি আমলেও হারেম প্রথা  প্রচলিত ছিল। মুঘল হারেমে পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজার নারীর অবস্থান ছিল বলে শোনা যায়। কথিত আছে, বাংলার সুলতান সিকান্দার শাহের হারেমে ১০ হাজার নারী ছিল। সম্রাটরা তাদের উপপত্নীদেরকে উপহার হিসেবে বিদেশি শাসকের কাছে আদান-প্রদান করতে পারতেন।

সে সব রক্ষিতাদের অনেক কিছুতেই ছিল বাধ্যবাধকতা। প্রাসাদের সাহিরে যাবার অনুমতি ছিল না তাদের। এমন কি অসুস্থ্য হলেও অন্য দাসদের চিকিৎসকের কাছে পাঠিয়ে পরামর্শ নেয়া হত এং ভিতরেই  চিকিৎসা ভিতরেই চলত।

ইতিহাসে এমন অনেক আরো প্রমান রয়ছে যেখানে নজর দিলে আমরা দেখতে পাই যে, আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত নারীদের সবসময় ভোগের পন্যই মনে করা হয়েছে। ইতিহাস তা-ই বলে। মুনিয়া হত্যা বা আত্মহত্যা নিয়ে আমরা শোক প্রকাশ করছি, আমরা আহত হচ্ছি, পরিবর্তন চাচ্ছি। আনভীরকে দোষারোপ করছি। কিন্তু এই আনভীর তো সমাজের নতুন কীট নয়! আনভীর তাঁর পুর্বুপুরুষদের ঐতিয্যকে ধরে রেখেছে। এমন আনভীরদের সংখ্যা আমাদের সমাজে লক্ষ লক্ষ। সমাজের উচ্চ শ্রেণির লোকদের জন্য নারী আদিকাল থেকেই ভোগপণ্য।  নির্দিষ্ট এই শ্রেণীর লোকেরা বৈধভাবে ঘরে রাখেন একজন ভোগপণ্য নারী এবং বাহিরে রাখেন একাধীক ভোগপণ্য নারী, যাদের বৈধতা নেই বলে তারা ‘বেশ্যা।”

ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস তাঁর ‘পরিবার, ব্যক্তিবর্গ সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’ নামক বিশ্ব বিখ্যাত গুন্থে বলেছেন “বেশ্যাদের থেকে সেই স্ত্রীর পার্থক্য কেবল এই যে, সে সাধারণ বেশ্যাদের মত রোজ নিজের দেহকে দিন মজুরের মত ভাড়া খাটায় না কিন্তু তার দেহকে সে একেবারেই চিরকালের দাসত্বে বিক্রি করে দেয়।”

যাই হোক, বেশ্যাবাজি আগেও  ছিল বাবু সমাজের সাধারণ ঘটনা, এখনো অব্যাহত আছে।  পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে ভোগপণ্য নয়, নারী মানুষ হিসাবে বিবেচিত হবে কবে? জানা নেই।  আমরা নারীর অধিকার নিয়ে চিল্লাই, গলা ফাটাই। নারীকে তো আগে মুক্ত হতে দিন! তারপর না অধিকারের কথা আসে?

 

এখন বলি মেয়েটিকে নিয়ে। মেয়েটার মা-বাবা নেই অর্থাৎ মাথার উপর ছাদ নেই। বড়বোনের মুখে যা শোনা। এ অবস্থায় ইন্টারেপড়া একটা মেয়ে কতটুকু বোঝদার হতে পারে? সে একটা আশ্রয় চাইবে, স্বপ্ন দেখবে একটা বাসস্থানের, সংসারের, এটাই তোস্বাভাবিক! বসুন্ধরার এমডি আনভীর আধা বয়সী মেয়েটাকে সংসার দিবে বলে ব্যবহার করেছেন। প্রেমের সম্পর্ক থেকেই একসাথে থেকেছে। একটি মধ্যবিত্ত নিন্মবিত্ত পরিবারের সব মেয়েদের জন্যই ‘অনেক সময়’ বড়লোক জামাই খোঁজা হয়, কারণবড়লোক জামাই হলে মেয়েটা আরামে থাকবে এবং পরিবারকে আর্থিক দিক দিয়ে সাহায্য করতে পারবে। এটা কোন কবিরা গুনাহ্না। যার যার প্রয়োজন এবং মন মানসিকতা। আজ বসুন্ধরার এমডি যদি আপনাকে প্রেমের অফার করতো, আপনি অস্বীকারকরতেন? তাও যদি বিশ্বাস অর্জন করে? খুব কম সংখ্যকই অস্বীকার করতেন।

প্রেমে পড়া, স্বপ্ন দেখা, প্রাকৃতিক নিয়ম। সেক্ষেত্রে আমরা অনেক সময় ভুল মানুষটিকে বাছাই করি, বিশ্বাস করি। আর লিভটুগেদারের কথা বলছেন? বর্তমান দিনে আমাদের সমাজের ৯০% মানুষ বিবাহের আগে প্রেমের সাথে শারীরিক সম্পর্কে সহমতপোষণ করছেন। তবে তারা দামী ফ্ল্যেটে পার্মানেন্ট থাকছেন  না, এটাই মুনিয়ার সাথে তাদের পার্থক্য।

মিডিয়া যদি সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করতেন, তবে বনানী গুলশানের এমন বহু ঘটনা বের হয়ে আসতো যা পর্দার আড়ালেইআছে। এবং সেই সাথে, যোগানদাতা হিসেবে বহু মাসী-পিসী-কাকা-মামা-ভাইয়াদের নামও বেরিয়ে আসতো।

আর ধর্মীয় মানুষগুলো যদি ধর্মীয় বিধান থেকে বিষয়টা বিচার করেন, তবে কিন্তু তার ধর্ম অবমাননা করার শাস্তি হয়ে গেছে।এখন অপরাধীর শাস্তির পালা। তারপরও কেন আপনারা মেয়েটারে ‘বেশ্যা’/ ‘রক্ষিতা’ বলছেন? অপরাধীর বিচার কেন চাচ্ছেননা? ধর্মীয় পোশাকের আড়ালে আপনারাও কি করছেন, তা তো জনাব মামুনুল প্রমান করে দিয়েছেন ইতিমধ্যেই। নতুন করে বলার কিছু নেই।

 

আত্মহত্যা নয়, হত্যা কেন বলছি? মুনিয়ার সঙ্গে আনভীরের সম্পর্ক দুই বছরের। এক বছর মেয়েটিকে বনানীর একটি ফ্ল্যাটেরাখার পর গত মার্চে গুলশানের এই ফ্ল্যাটে ওঠে মুনিয়া। গত ২৩শে এপ্রিল ইফতার পার্টি হয় ওই বাসায় এবং পার্টির ছবিফেসবুকে আপলোড করা নিয়ে মুনিয়ার সঙ্গে আনভীরের মনোমালিন্য হয়। ছবি মুছে ফেলতে না চাইলে বিভিন্নভাবে হুমকি দিতেথাকে তানভীর। এরপরের দিন সকালে ৫০ লাখ টাকা চুরির অভিযোগে ফোন দিয়ে মুনিয়োকে টাকা ফেরৎ দেয়ার হুমকিও দেয়।সে তার বোনকে ফোন করে জানায়, সে ঝামেলায় পড়েছে। এরপরই মুনিয়াকে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।

এখানের আসল ঘটনা আমরা সবাই জানি। আনভীর তাকে সেই পূর্বপুরুষ, আদিকালের ঐতিয্যধারক হিসাবে ব্যবহার করেছে। অসহায়ত্বের সুযোগে মানবিক হয়নি, ভোগ করেছে। মেয়েটা বোকাছিল বিধায় সংসার করার স্বপ্ন দেখেছিল। সে জানতো না আদিকালের ইতিহাস, জানতো না তারা বিত্তশালীদের হাতে তারা কেবল ভোগপণ্য।

বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীর, মুনিয়ার হত্যার পর, আদালতের নিষেধাজ্ঞা দেওয়ারআগেরদিন অর্থাৎ ঘটনার দিন ২৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় কার্গো বিমানে করে দেশ ত্যাগ করেছেন। হত্যার পর বিদেশ পলায়নআনভীরের পরিবারে এই প্রথম নয়। ২০০৬ সালের ৪ জুলাই রাতে গুলশানের একটি বাড়ীর ছাদ থেকে বসুন্ধরাটেলিকমিউনিকেশসন্স নেটওয়ার্ক লিমিটেডের পরিচালক সাব্বিরকে ছাদ থেকে নীচে ফেলে হত্যা করেন বসুন্ধরা গ্রুপের এমডিসাফিয়াত সোবহান সানবীর(আনভীরের বড় ভাই)। সে সময় তিনিও দেশত্যাগ করে এক পর্যায়ে বেঁচে যান। এছাড়াও, বসুন্ধরাপ্রকল্পের উৎপত্তির পিছনে পানির খালে মাটি ভরাট করে জমি দখলের বহু কাহিনিও শোনা যায়।

এরপরও এই পরিবারটির বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে রাজি নন। এমন কি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া মুনিয়ার হত্যা নিয়ে আসামীর ছবি বা নাম নিতেও অনেকে চিন্তা করছেন। অনেক পত্রিকায় লোকটার ছবিও আসেনি। ভিকটিমের ছবি দেয়া হচ্ছে যানারী শিশু নির্যাতন আইনে  নিয়ম বহির্ভূত। চ্যানেল আই তাদের সংবাদে অভিযুক্তের ছবি(আনভীর) ব্ল্যার করে ভিকটিমের(মুনিয়া) ছবি হাইলাইট করেছিলেন।কেন? কারণ বসুন্ধরা সরকারের অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখেন। এখানে আসামীকেছাড় দিতেই হবে। বসুন্ধরার আর্থিক বদান্যতায় বহু বিশেষ ব্যাক্তিরা, কোম্পানি, মিডিয়া, চলে।

বাংলাদেশে মানববন্ধন একটা শক্তিশালী প্রতিবাদ। বিভিন্ন হত্যা, ধর্ষণ , পিটানির ঘটনা নিয়েও যেখানে মানববন্ধন হয়, সেখানেএতিম একটি মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে হত্যা করার পরও বসুন্ধরার এমডি আনভীরের শাস্তির প্রতিবাদে তিন দিন পরও কোনমানবন্ধন হয়নি। ব্যারিষ্টার সুমনের প্রতিবাদমূলক ভিডিও প্রকাশ হবার পর ঢাকা এবং চট্টগ্রামে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তানকমান্ডের দুইটা মানববন্ধন চোখে পড়ল।

এবারো বিত্তশালী এই বসুন্ধরা পরিবার বেঁচে যাবেন। কারণ মামলা করা হয়েছে, ‘আত্মহত্যার প্ররোচনা’ নামে। ব্যারিষ্টার সুমনবলেছেন, ‘আত্মহত্যার প্ররোচনা বলতে কোন আইন নেই। মামলা হওয়ার কথা ছিল হত্যাকান্ডের। তাহলে সুষ্ঠু তদন্ত হত। ‘আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলায় আসামী খালাস পেয়ে যাবেন সহজে।’

এদিকে নতুন করে মোসারাত জাহান মুনিয়ার মৃত্যুর ঘটনায়  জাতীয় সংসদের হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা করেছেন মুনিয়ার ভাই আশিকুর রহমান সবুজ। এই রহস্যের অন্তরালের রহস্যও আমরা জানি। অর্থের বিনিময়ে মৃত বোনকে নিয়ে কাবাডি খেলতেও আমরা এখন প্রস্তুত আছি। এটাই বাস্তবতা। মাঝ খানে কি হবে? আনভীর বেঁচে যাবে। কারণ, পরিবারের দ্বারা করা একাধীক মামলার কোন যুক্তিগত মেরুদন্ড নেই। তারউপর এটা ‘আত্মহত্যা প্ররোচনা” মামলা।

আমরা এভাবেই আছি। অভ্যস্ত হতে পড়েছি। এভাবেই ঘটনা, দৃশ্যপট বদলে গেলে একদিন মুনিয়াদেরও আমরা ভুলে যাবো।