আত্মহত্যা

আত্নহত্যা বর্তমানে আমাদের সমাজে ডাল-ভাত। প্রেমে ব্যার্থতা, পরকীয়া, স্বামী স্ত্রীর কলহ,পরীক্ষায় ব্যর্থতা, মা এর বকুনি, বাবার কড়া শাসন, অভাব, জীবনে অপ্রাপ্তি, এমনকি বন্ধুর সাথে ঝগরার মত সামান্য ব্যাপারেও মানুষ আত্নহত্যা করে বসে। সব কিছু বিশ্লেষন করলে দেখা যায় ওই একটা জায়গায়ই আমরা হেরে যাই, আর তা হলো -অভিমান, আবেগ ও জ্ঞান-বুদ্বিহীন বিচার ক্ষমতা।

আত্নহত্যা মহাপাপ। এটা জেনেও কেন তাহলে মানুষ আত্নহত্যা করে? কারন একটাই। বেঁচে থাকা যখন কোন কারনে অসহনীয় উঠে এবং তা থেকে মুক্তির কোন পথ মানুষ খুঁজে না পায়, তখনই ঘটতে থাকা প্রবাহমান নিত্য যন্ত্রনা গুলো থেকে মুক্তির আশায়, মৃত্যু পরবর্তি অনিশ্চয়তাকেই মানুষ একমাত্র অবলম্বন হিসাবে বেছে নেয়।

আত্নহত্যা সহজ নয়। সুস্থ্য মানুষের পক্ষে কখনো এই পথ বেছে নেয়া সম্ভব নয়। আত্নহত্যার প্রবনতা এক ধরনের মানসিক সমস্যা। আর এ সমস্যা তৈরী হয় প্রচন্ড ক্রোধ, আবেগ ও অপ্রাপ্তি থেকে। একজন মানুষ যখন মনে করেণ যে তিনি বেঁচে থাকার সমস্ত উপকরন হাড়িয়ে ফেলেছেন এবং তার চলে যাওয়ায় পৃথিবীর কিছু যায় আসেনা, তখনই তিনি আত্নহত্যার পথ বেছে নেন! এটা তার অভিমান। সেই অভিমান যে ভুল ও হতে পারে, তা বিচার করার মত মানসিক ক্ষমতা তার থাকেনা!
আবার অনেকেই জীবনের কঠিন মুহুর্তগুলো থেকে মুক্তির পথ খুঁজে না পেয়ে, পারিবারিক সহায়তার অভাবে, একাই নিজের জীবনের সমাপ্তি টানতে এই পথ বেছে নেন।
কেউ কেউ তার ভুল কোন পদক্ষেপের মাশুল হিসাবে আত্নহত্যা করেণ।
মানসিক অবসাদ ও বিষাদ্বের পাশাপাশি আরো একটি সূক্ষ্ম কারণ, যা মানুষকে সহজেই আত্নহননের পথে ঠেলে দেয়, তা হলো নিঃসঙ্গতা। মনের ক্ষত বা অবসাদের কথা ব্যাক্ত করার মত স্বহ্নদয় কোন বন্দ্বু বা কাছের মানুষ যখন খুঁজে পাওয়া না যায়, ধীরে ধীরে সে ক্ষতই এক সময় আমাদের পুরো স্বত্তাকে গ্রাস করে, মানসিক ভাবে আমাদের ভাল-মন্দ বিচার ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়। আর তখনি আত্মহত্যা হয়ে উঠে মুক্তির একমাত্র পথ।

কারণ যাই হোক, আত্নহত্যা কোন সমাধান হতে পারেনা।

কোরআনে বলা হয়েছে আত্নহত্যা মহাপাপ! এ বিষয়ে সতর্ক করে মহান রাব্বুল আল-আমীন বলেন, “আর তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু। এবং যে কেউ জুলুম করে, অন্যায়ভাবে উহা (আত্মহত্যা) করবে, অবশ্য আমি তাকে অগ্নিদগ্ধ করবো, আল্লাহর পক্ষে উহা সহজসাধ্য।” (সূরা-নিসা-২৯-৩০)

আত্মহত্যা কোনো অবস্থাতেই কাম্য হতে পারে না। আত্মহত্যার মাধ্যমে একটি জীবনই শুধু নষ্ট হয় না, একটি পরিবার ও আত্মহত্যাকারীর আপনজন -বান্ধবদের উপর ও এর বিরুপ প্রভাব পরে। এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, আত্মহত্যাকারীদের দুই-তৃতীয়াংশই আত্মহত্যার পূর্বে নিজেদের ইচ্ছা সম্পর্কে অন্যের কাছে কম-বেশী তথ্য দেয়। ওসব তথ্যকে নজরে রেখে, পরিবার বা বন্দ্বু-বান্দ্বব সকলেই যদি সতর্ক থাকে এবং সময়মত যথাযত ব্যাবস্থা নেয়, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতে পারে। প্রয়োজনে ডাক্তার বা কাউন্সিলিং এর ব্যাবস্থা করতে হবে।
তার পাশাপাশি, প্রতিটা সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে, একে অপরের প্রতি সদয় মনোভাব রাখতে হবে। সমস্যা হতেই পারে। দুঃখ-কষ্ট নিয়েই আমাদের জীবন। সেটাকে সাহসের সাথে মোকাবিলা করাই বুদ্বিমানের কাজ। আজ আপনি কারো কাছে কষ্ট পেয়ে চলে গেলেন,
আপনার চলে যাওয়ায় , আপনার জন্মদাত্রী মা কতটা কষ্ট পেল, তা কি ভেবেছেন?

আমাদের দেশে সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি, ধর্মীয় শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়াতে হবে। তরুন সমাজ ও সবার মাঝে ধর্মীয় সচেতনা বৃদ্বি পেলেই, জীবন যে সৃষ্টিকর্তার দান এবং সেই জীবনের একটা মহৎ উদ্দেশ্য আছে, তা মানুষর বোধগম্য হবে। ধর্মীয় শিক্ষার অভাবেই দেখা যায় জেনে, না জেনে আমাদের তরুন/তরুনী এমনকি বয়োবৃদ্বরাও নানান অপকর্মে জড়িয়ে পরে। আর সেই থেকেই বেড়ে যায় তাদের জীবনে নানান হতাশা বা বিষাদ। বিষাদ্বের পরিসমাপ্তি হয় অপমৃত্যু দিয়ে। অপমৃত্যুর জন্য আল্লাহ পাক রাব্বুল আল-আমিন নিশ্চয় মানুষকে সৃষ্টি করেননি ।

আমাদের সরকারকেও এ ব্যাপারে অগ্রনী ভুমিকা রাখতে হবে। মানসিকভাবে উৎপীড়িত মানুষের জন্য জরুরি ব্যবস্থা হিসাবে শহর ও গ্রামে যদি ক্রাইসিস ইন্টারভেনশন সেন্টার খোলা হয়, পাশাপাশি প্রতিটি হাসপাতালের মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ও সাইকোলোজিস্ট এবং সোসাল ওয়ার্কার রাখা হয়, তাহলে অনেকাংশেই সঠিক সময়ে ভিক্টিম নির্নয় ও তাদের রোগ নিরাময় করতে সুবিধা হবে।

জীবন যুদ্ধে যে হেরে যায়, পৃথিবী তাকে মনে রাখেনা। যে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে, পৃথিবী তাকে স্বরণ রাখে। পৃথিবীর বুকে আমাদের আগমন কেবল এক বার। আসুন সেই এক জনমকে ব্যার্থতা দিয়ে নয়, সফলতা দিয়ে পরিপূর্ন করে তোলি। যতক্ষন আপনার আত্ববিশ্বাস প্রখর আছে, ততক্ষন আপনি দূর্বল নন। ইচ্ছে করলে আপনিও পারেন সমস্ত দুঃখ, হতাশা, নির্মমতার বিরুদ্বে রুখে দাঁড়াতে। আর তাতে আপনার সাহস ও মনোবলটাই দরকার কেবল।

হারলেন কি জিতলেন, তা মুখ্য নয়। যুদ্ধা হয়ে বেঁচে থাকুন। জন্মানোর স্বার্থকতা এখানেই।

 

____HB Rita